আইএমএফের সতর্ক বাণী

বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনিশ্চিত করে ফেলছে বাণিজ্য ঝুঁকি

বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্ক বাড়ানো ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্ক বাড়ানো ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে আছে। এর পেছনে বড় কারণ বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত ঘিরে দ্বিধা। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে জুলাইয়ের শেষ দিকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির নতুন পূর্বাভাস প্রকাশ করবে আইএমএফ। খবর রয়টার্স।

আইএমএফের ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথ শুক্রবার বলেন, ‘শুল্ক বাড়ার আগেই আমদানির গতি কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু বাণিজ্য অন্য দেশে স্থানান্তর হয়েছে এবং আর্থিক অবস্থারও কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। এসব ইতিবাচক দিক বিবেচনায় নিলেও সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বেশ স্পষ্ট। আমরা এসব বিষয় আমলে নিচ্ছি।’ দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরদের বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে আইএমএফ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২০২৫ সালের জন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশ ও ২০২৬ সালের জন্য দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৩ শতাংশ করেছিল। তখন সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পূর্বাভাসে আইএমএফ কিছুটা ইতিবাচক সংশোধন আনতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বেশকিছু দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি অনেক দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমছে। এসব পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চিত্র আগের তুলনায় কিছুটা ভালো দেখাতে পারে।

তবে গোপিনাথ বলেন, ‘বাণিজ্য উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। নতুন পূর্বাভাসে আমরা এসব বিষয় প্রতিফলিত করব। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কাই এখন বেশি।’

তিনি জানান, দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে রাজস্ব খাতে সংস্কার দরকার। একই সঙ্গে, ঋণ যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সেজন্য তা টেকসই পথে নিতে হবে।

গোপিনাথ আরো বলেন, ‘দেশভেদে ভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই একই ধরনের নীতির বদলে নির্দিষ্ট দেশের প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে যেন তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।’

আইএমএফ জানিয়েছে, উদীয়মান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশে এখনো পুঁজির প্রবাহ দুর্বল হলেও তা স্থিতিশীল রয়েছে। তবে এসব দেশের জন্য অর্থায়নের শর্ত এখনো কঠিন। যারা অতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত, তাদের জন্য সময়মতো ও কার্যকর ঋণ পুনর্গঠন জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।

গোপিনাথ বলেন, ‘ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরো কাজ করার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে জি২০-এর সাধারণ ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির কারণে বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা আরো বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন থেকে আমদানি করা বেশ কয়েকটি পণ্যের ওপর ২৫-৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এতে বিশ্বজুড়ে আবারো বাণিজ্য ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা আসতে পারে, এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে পণ্যমূল্য বাড়তে পারে এবং ভোক্তা খরচের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এর প্রভাব এরই মধ্যে দেখা গেছে।

আইএমএফ বলছে, এ ধরনের শুল্কনীতির কারণে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগেভাগেই পণ্য আমদানি করে নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতের উচ্চ শুল্ক এড়ানো যায়। ফলে স্বাভাবিক বাণিজ্য চক্র বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সরবরাহ চেইনে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা মেক্সিকোর মতো বাজারে উৎপাদন স্থানান্তরের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোকে একীভূত করা কানাডিয়ান প্যাসিফিক ও কানসাস সিটি সাদার্নের মতো বড় রেল কোম্পানির চুক্তি এবং নতুন শুল্ক কাঠামো বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যের কাঠামো পরিবর্তন করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে বেশি। এ কারণে সুদহার নিয়ে দ্রুত কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা কম। অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকই আপাতত সুদহার অপরিবর্তিত রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চাইছে। কারণ তারা দেখতে চায়, বর্তমান নীতির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি কতটা কমছে এবং অর্থনীতির গতি কোন দিকে যাচ্ছে।

গোপিনাথ বলেন, ‘যারা অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে, তাদের জন্য আসন্ন দিনগুলোয় সময়মতো ঋণ পুনর্গঠন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় করণীয়।’

আরও